অপরের স্ত্রী থেকে শুরু করে মেয়েরা হত রাজার যৌন লালসার শিকার! ইতিহাসের অধঃপতনকারী রাজারা - Ei Bangla
Ei Bangla ব্লগ অপরের স্ত্রী থেকে শুরু করে মেয়েরা হত রাজার যৌন লালসার শিকার! ইতিহাসের অধঃপতনকারী রাজারা

অপরের স্ত্রী থেকে শুরু করে মেয়েরা হত রাজার যৌন লালসার শিকার! ইতিহাসের অধঃপতনকারী রাজারা


বর্তমানে একটা দেশ শাসন করে সরকার কিন্তু পূর্বে সেই শাসনভার ছিল রাজ রাজা ও সম্রাটদের হাতে। ইতিহাসের পাতা খুললে দেখা যাবে অনেক দয়ালু রাজার জনগণের প্রতি প্রেমের ব্যাখ্যা তো কিছু জায়গায় দেখা যাবে নিষ্ঠুর রাজার মর্মান্তিক অত্যাচারের কাহিনী। কোন রাজবংশের পতন ঘটে সেই বংশরই কোন সম্রাট কিংবা রাজার অধঃপতনের কারণে। চারিত্রিক দোষ সহ এমন বেশ কয়েকটি বাজে দিক থাকে রাজাদের যার কারণে প্রজারা তাকে সমর্থন করে না এবং সেই সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। সেরকমই ঠিক তিনটি অধঃপতনকারী রাজাদের নিয়েই তৈরি হয়েছে এই প্রতিবেদন। যেমন

I) সম্রাট ক্যালিগুলা :- সম্রাটের গল্প শুরু হয়েছিল ৩৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে। সেই সময় রোমের সম্রাট ছিলেন ক্যালিগুলার কাকা।

কিন্তু সেই সময় আচমকা কাকার মৃত্যু হওয়ার পর সিংহাসন দখল করেছিলেন সম্রাট ক্যালিগুলার। অনেকের অনুমান সিংহাসনে বসবে বলেই সম্রাট নিজের কাকাকে হত্যা করেছিলেন, যদিও এই বিষয়ে সঠিক কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। যাই হোক এরপর তিনিও একই রকম ভাবে নিজের কাকার মতো শাসন সামলানোর কয়েক দিনের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। রোমানীয়রা ভেবেছিল হয়তো তাকে আর বাঁচানো সম্ভব হবে না, তাই পরবর্তী সম্রাট হিসেবে সকল মন্ত্রীরা তারই উত্তরসূরি গেমেলাসকে তৈরি করছিলেন। কিন্তু সকলকে অবাক করে দিয়ে মাত্র এক মাসের মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন সম্রাট ক্যালিগুলার। অনেকটাই নতুন জন্ম পাওয়ার মতন ঘটনা। তবে সম্রাট আর এই নতুন জন্ম অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছিল রোমবাসীদের জন্য। কারণ সম্রাট সম্পূর্ণরূপে সুস্থ হওয়ার পরেই এক হিংস্র রূপ ধারণ করেছিলেন। তার নিত্যদিন শয্যা সঙ্গিনী হিসেবে লাগতো হাজার হাজার দাসীদের। একটা সময় দাসীদের দিয়ে সন্তুষ্টী পেতেন না তিনি, সম্রাটের নজর পড়েছিল শহরের সিনেটরদের স্ত্রী ও মেয়েদের উপরে। জোর করে সিনেটরদের স্ত্রী এবং মেয়েদের নিজের যৌনদাসী বানাতেন সম্রাট। শুধু নারী সঙ্গই নয় তার প্রয়োজন হতো বিলাসবহুল জীবনের। আর সেই জীবনযাপন করতে প্রয়োজন ছিল প্রচুর অর্থের। সে কারণে অর্থ উপার্জনের জন্য দ্বিগুণ পরিমাণে কর বৃদ্ধি করার পাশাপাশি প্রজাদের কাছ থেকে নিজের সৈনিকদের দ্বারা জোরপূর্বক ধনসম্পত্তি ছিন্তাই করতেন সম্রাট। এমন কি সম্রাটের ভয় ছিল যে তার প্রতিপক্ষরা তাকে হত্যা করতে পারে, তাই আগেভাগে সকল প্রতিপক্ষকে এমন কি নিজের উত্তরসুরিকেও নিজেই হত্যা করেছিলেন তিনি। এক কথায় বলতে গেলে সম্রাটের কারণে অতিষ্ট হয়ে উঠেছিল রোমবাসি। যদিও বেশি দিন এই উদ্ধত্যতা সহ্য করতে হয়নি তাদের। সম্রাটের শাসনের চার বছরের মাথায় এক ঠেলার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে তাকে প্রথম চাকু মেরেছিলেন তারই একজন দেওরক্ষী। এরপর কয়েকজন প্রিটোরিয়ান রক্ষী বারংবার প্রায় ৩০ বার ছুরিকাঘাত করার পর তার মৃত্যু হয়েছিল। গোটা রোমের বাসিন্দারা সম্রাটের মৃত্যুতে সারা রাত মদ্যপান করে আনন্দে মেতে ছিলেন। তখনকার সময়টা ছিল ৪১ খ্রিস্টাব্দের ২৪শে জানুয়ারি, যখন নিষ্ঠুর সম্রাটের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছিল গোটা রোম।

II)রাজা এরিক চতুর্দশ :- ১৫৬০ সালে সুইডেনের রাজা ছিলেন এরিক চতুর্দশ। তবে সকলের মতে রাজ সিংহাসনে বসার আগে থেকেই তার মানসিক পরিস্থিতি ভালো ছিল না। যদিও দিনে দিনে সেটি আরো খারাপের দিকেই গিয়েছিল। তিনি একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী রাজা ছিলেন বলেই রেনেসাঁর স্বরকে ব্যক্ত করেছিলেন। উত্তর-পূর্ব ইউরোপে অবস্থিত বান্টিক অঞ্চলকে নিয়ন্ত্রণ করার আশায় ডেনমার্ক এবং এস্তোনিয়া সহ বেশ কয়েকটি দেশের উপর যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন তিনি।

স্বাভাবিকভাবেই যুদ্ধ করতে গেলে অর্থের প্রয়োজন হয় প্রচুর, তাই সেই সব অর্থের জোগান দেওয়ার জন্য প্রজাদের উপর প্রচুর পরিমাণে কড় ধার্য করার পাশাপাশি আভিজাত্যদের ক্ষমতা সীমিত করার প্রয়াস করেছিলেন তিনি। কারণ তার বিকৃত মস্তিষ্ক একটা কথাই বলত যে আভিজাত্য ব্যক্তিরা তার ক্ষতি করে দিতে পারে। দিনকে দিন তার মানসিক অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে গিয়েছিল যে তার যাতে কেউ ক্ষতি করতে না পারে সেই জন্য শত শত মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সঙ্গে কিছু অভিজাতপূর্ণ মানুষদের বন্দি করে রেখেছিলেন তিনি।

১৫৬৭ সালে তার বিষণ্ণতা চরমে পৌঁছেছিল। তার ব্যক্তিগত রক্ষীদের সহায়তায়, এরিক উপসালা দুর্গের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করেন এবং নিলস সভান্তেসন স্টুর সহ স্টুর পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যকে হত্যা করেন, যাদেরকে রাজা সরাসরি নিজেই ছুরিকাঘাত করেছিলেন। এই ঘটনার প্রায় এক বছর পর নিজের সৎ ভাইয়ের সফল বিদ্রোহের দ্বারা উৎখাত হয়েছিলেন এরিক। যিনি সুইডেনের নতুন রাজা হয়েছিলেন তিনি এরিকে আজীবন কারারুদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন, এমনকি সেই নির্দেশ মতন কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় ১৫৭৭ সালে মৃত্যু হয়েছিল তার।

III) অটোমান সুলতান ইব্রাহিম :- ১৬৪০ সালে শুরু হয়েছিল অটোমান সুলতান ইব্রাহিম তথা পাগল ইব্রাহিমের গল্প। সেই বছর তার বড় দাদা মারা যাওয়ার পর সিংহাসনে বসেছিলেন ইব্রাহিম। তার দাদা যতদিন শাসন ভার সামলে ছিলেন ততদিন বাইরে দুনিয়ার সঙ্গে কোন রকম সম্পর্ক ছিল না সুলতান ইব্রাহিমের। সেই সময় প্রায় টানা চার বছর উসমানীয় প্রাসাদের একটি এলাকা কাফেসের অভ্যন্তরে কাটিয়েছিলে তিনি। তার উত্তরাধিকারীদের চার বছর একটি ঘরে তালা বন্ধ করে রেখেছিল সিরোসিস। আংশিক ঐতিহাসিকদের মতেই দীর্ঘ বছর ধরে একটি ঘরে আবদ্ধ থাকার কারণেই তার মানসিক স্থিতির কিছুটা পরিবর্তন ঘটেছিল।

পরবর্তীকালে সিংহাসনে বসতেই আজব আনন্দে মেতে উঠেছিলেন সুলতানি ইব্রাহিম। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, নিজের দাড়ি হীরে দিয়ে সাজিয়েছিলেন তিনি, এমনকি আজব সুগন্ধি দিয়ে গোটা রাজপ্রাসাদের পর্দা সুগন্ধি করে তুলেছিলেন, এছাড়া তিনি বিড়াল পোষা পছন্দ করতেন বলে দামি ও নরম পছন্দের কাপড় ব্যবহার করতেন তার পোষ্য বিড়ালদের জন্য।

এই সমস্ত আজব আনন্দ থাকার পাশাপাশি তার অন্য একটি নেশা ছিল নারী। নিজের শতাধিক স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও বহু দাসী এবং কুমারীদের নিজের শয্যা সঙ্গিনী করেছিলেন তিনি। তার আলাদা একটা ঝোঁক ছিল কুমারী নারীদের প্রতি। এই সমস্ত কাজের জন্য তার কোন শত্রুতা না থাকলেও তিনি ছিলেন একজন হত্যাকারী। এখানে বলে রাখা ভালো যে নিজের স্ত্রী হোক কিংবা অন্য কোন মহিলা কারো সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতেন না তিনি। এক সময় তার যৌন সাধ পূরণকারী ২৮০ জন দাসীকে একটি বস্তায় বেঁধে পুকুরে ফেলে হত্যা করেছিলেন সম্রাট। এমনকি নিজের গ্ৰান্ড ভিজিআরকেও(সেনাবাহিনীর প্রধান নেতা) তিনি হত্যা করেছিলেন। এক কথায় বলতে গেলে যার প্রতি সম্রাটের সন্দেহ জাগতো যে ওই ব্যক্তি তার ক্ষতি করতে পারে তাকেই তিনি হত্যা করে দিতেন। তবে দীর্ঘদিন এমন উশৃংখলার সঙ্গে শাসনভার সামলানো সম্ভব হয় না কারোর পক্ষে। সম্রাটের পক্ষেও সেটার ব্যতিক্রম হয়নি। তার শাসনের প্রায় আট বছর পর অর্থাৎ ১৬৪৮ সালের আগে বন্দী করা হয়েছিল এবং শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড পেয়েছিলেন সম্রাট সুলতান ইব্রাহিম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Post

‘ঔরঙ্গজেব ও হীরাবাঈ’ (ঐতিহাসিক প্রেম ২)‘ঔরঙ্গজেব ও হীরাবাঈ’ (ঐতিহাসিক প্রেম ২)

রানা চক্রবর্তীঃ হাজার বার মাথা ঠুকেও ইতিহাসে প্রেমিক ঔরঙ্গজেবকে খুঁজে পাওয়া যায় না। শেষ শক্তিশালী মোঘল সম্রাট নিজেও ইতিহাস রক্ষার জন্য তেমন কোন যত্ন নেননি, বরং সবকিছু মুছে ফেলতেই চেষ্টা

নজরুল-প্রমীলা বিবাহ প্রসঙ্গেনজরুল-প্রমীলা বিবাহ প্রসঙ্গে

রানা চক্রবর্তীঃ ইতিহাসে নজরুল পত্নী ‘প্রমীলা’ এক ‘pathetic’ চরিত্র। অপর পক্ষে নজরুল ইসলামের বিয়ে প্রথমে ঠিক হয়েছিল (মতান্তরে বিয়ে হয়েছিল) যে মহিলার সাথে, সেই ‘নার্গিস’কে বলা যায় ‘ট্র্যাজিক’ চরিত্র। আর

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে রামকৃষ্ণ মিশন (প্রথম পর্ব)ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে রামকৃষ্ণ মিশন (প্রথম পর্ব)

রানা চক্রবর্তীঃ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম প্রধানতঃ তিনটি ধারায় প্রবাহিত হয়েছিল, (ক) সশস্ত্র বিপ্লব – চরমপন্থা আন্দোলন, (খ) গান্ধীজীর নেতৃত্বে অহিংস গণ আন্দোলন, এবং (গ) নেতাজি সুভাষচন্দ্রের নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ বাহিনীর

বিশ্বের বৃহত্তম এবং সবচেয়ে শক্তিশালী ইঞ্জিনবিশ্বের বৃহত্তম এবং সবচেয়ে শক্তিশালী ইঞ্জিন

এটাই সেই ইঞ্জিন; ১ লাখ ৯ হাজার হর্সপাওয়ার শক্তি-সম্পূর্ণ Wartsila sulzer RTA96-C বিশ্বের বৃহত্তম এবং সবচেয়ে শক্তিশালী ইঞ্জিন! ● নির্মাতা কোম্পানি: Built in Finland ● এটার ওজন ২,৩০০টন এবং ৪৪-ফুট

হেস্টিংস সাহেবের হানাবাড়িহেস্টিংস সাহেবের হানাবাড়ি

রানা চক্রবর্তীঃ কলকাতার আলিপুরের ‘বেলভেডিয়ারের বাড়ির’ সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক রোমাঞ্চকর ঘটনা। এটি ছিল ‘লাটসাহেবেব পুরনো বাড়ি’, বর্তমানে এখানেই গড়ে উঠেছে আমাদের ‘ন্যাশনাল লাইব্রেরি’। এই বাড়িতেই একসময় বসবাস করতেন ‘বহু