শিম্পাঞ্জিকে নিয়ে পরীক্ষা করতে এক দম্পতি নিজের পুত্র সন্তানের সঙ্গে বড় করেছিলেন এক কন্যা শিম্পাঞ্জীকে! কি হয়েছিল শেষ পর্যন্ত? - Ei Bangla
Ei Bangla ব্লগ শিম্পাঞ্জিকে নিয়ে পরীক্ষা করতে এক দম্পতি নিজের পুত্র সন্তানের সঙ্গে বড় করেছিলেন এক কন্যা শিম্পাঞ্জীকে! কি হয়েছিল শেষ পর্যন্ত?

শিম্পাঞ্জিকে নিয়ে পরীক্ষা করতে এক দম্পতি নিজের পুত্র সন্তানের সঙ্গে বড় করেছিলেন এক কন্যা শিম্পাঞ্জীকে! কি হয়েছিল শেষ পর্যন্ত?


ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে সেখানে উল্লেখ করা রয়েছে মানুষের পূর্বপুরুষ ছিল শিম্পাঞ্জি কিংবা হনুমান। অর্থাৎ বংশানুক্রমে ও কালের পরিবর্তনে এই শিম্পাঞ্জিরাই আস্তে আস্তে মানুষে রূপান্তরিত হয়েছে এবং সভ্য হয়ে উঠেছে। সেরকমই একটা শিম্পাঞ্জি থেকে মানুষ হওয়ার যে দীর্ঘ পথ এটা কিভাবে অতিক্রম হয়েছে এবং জেনেটিক কি পরিবর্তন এসেছে সেটি পরীক্ষা করেছিলেন কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র উইনথ্রপ কেলগ।

সময়টা ছিল ১৯২৭ সাল। সেই সময় উইনথ্রপ ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটিতে অধ্যায়ন করছিলেন দর্শন ও মনোবিজ্ঞান বিষয়। তবে সেখানে স্নাতক ডিগ্রী পাওয়ার পর কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে চলে গিয়েছিলেন স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভের জন্য।

তার বিশেষ আগ্রহ ছিল কন্ডিশনিং এন্ড লার্নিং এই দুটি বিষয়ের উপর। সে কারণেই এই বিষয় নিয়ে গভীরভাবে চর্চা করা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল তার। পড়াশোনা করার পাশাপাশি তারই এক সহপাঠী লুয়েলা কেলগের সাথে পরিচয় হয়েছিল উইনথ্রপের। এরপরেই পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব এবং বন্ধুত্ব থেকে প্রেমের দিকে গড়িয়েছিল তাদের সম্পর্ক।

পরবর্তীকালে ১৯২৯ সালে সেই ভালোবাসার সম্পর্কের পরিণয়ন ঘটেছিল। উইনথ্রপ ও লুয়েলা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। এরপরই বছরখানেকের মধ্যেই ডোনাল্ড নামের এক পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন লুয়েলা। এই পুত্র সন্তানই তাদের কাছে পরীক্ষার মূল যন্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

তিনজনের এই পরিবারে ১৯৩১ সালে যুক্ত হয়েছিলেন আরো একজন সদস্য। না সে কোন মানুষ নয় বরং একজন শিম্পাঞ্জির সাত মাসের শিশু কন্যা সন্তান। এই কন্যা সন্তানের জন্ম হয়েছিল কিউবার অঞ্চলের একটি প্রাইভেট রিসার্চ সেন্টারে। যখন শিশুটির সাত মাস বয়স হয়েছিল তখন তাকে মা শিম্পাঞ্জীর কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে কেলগ দম্পতির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। এই দম্পতি দত্তক নেওয়া বাচ্চা শিশু শিম্পাঞ্জীর নাম দিয়েছিলেন গুয়া। তবে তারা জানতেন যে ভবিষ্যতে মানুষ এবং শিম্পাঞ্জির মধ্যে এই পরীক্ষার কারণে অনেক কটু কথা শুনতে হতে পারে তাদের। যাইহোক দুনিয়ার চিন্তা না করে নিজের পরীক্ষা চালিয়ে গিয়েছিলেন তারা।

যখন ‌উইনথ্রপ এবং লুয়েলা কেলগ সাড়ে সাত মাস বয়সী শিশু শিম্পাঞ্জি তথা গুয়াকে নিজের বাড়িতে এনেছিলেন তখন তাদের ছেলের বয়স ছিল মাত্র ১০ মাস। তারা দুই শিশুকে একে অপরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন ভাই বোন হিসেবে। সেরকমই আর পাঁচটা ভাইবোন যেভাবে একসঙ্গে খেলা করে খাওয়া দাওয়া করে বেড়ে ওঠে তারাও ধীরে ধীরে একইভাবে বেড়ে উঠছিল। তারা একসঙ্গে চেয়ারে বসা থেকে শুরু করে একই চামচে খাবার খাওয়া, একই কমিক বই পড়া, একসঙ্গে গুড নাইট কিস করে ঘুমাতে যাওয়া ও একই বিছানায় ঘুমাতো তারা।

আরো পড়ুন- বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য নিজের প্রান দিতে পর্যন্ত পিছপা হননি! কে ছিলেন আমস্টারডামবাসী এই আব্রাহাম?

ডোনাল্ড ও গুয়ার দৈনন্দিন রুটিন ছিল প্রায় এরকম যে –

সকাল ৭ টায় একসঙ্গে ঘুম থেকে উঠতো দুই ভাই-বোন। এরপর সাড়ে সাতটা নাগাদ সকালের খাবার খেয়ে ৯টা থেকে ১২ টা পর্যন্ত চলত নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা। সমস্ত পরীক্ষা হয়ে গেলে ১২:১৫ ঘুমানো এবং সাড়ে তিন থেকে চারটে পর্যন্ত ছিল ফের পর্যবেক্ষণের সময়। এরপর সন্ধ্যে ছটা নাগাদ রাতের খাবার খেয়ে ৬:৩০-এর মধ্যে ঘুমিয়ে পড়তো তারা। যেহেতু সেই সময় কোন ফেসবুক কিংবা ইউটিউব ছিল না তাই সব কাজ তাড়াতাড়ি এবং এই দুই ভাই বোনের সমস্ত কর্মকাণ্ড ভিডিও করে রাখতেন দম্পতি।

কেলগস দম্পতি শুধুমাত্র যে তাদের শিশুদের লালন পালন করেছে তাই নয়, উপরন্ত তাদের একাধিক বিষয়ের নজরও রেখেছেন। যেমন বলা যায় যে, দুজনের গতিবিধি, কথা বলার ধরন, কোন কাজের প্রতিক্রিয়া দেওয়া, স্মৃতিশক্তি, রক্তচাপ, প্রতিচ্ছবি, আচরণ, খেলাধুলা, ভারসাম্য, ভয় ইত্যাদি একাধিক সাইকোলজিক্যাল বিষয়।

এছাড়াও ডোনাল্ড ও গুয়ার মধ্যে কার সংবেদনশীলতা সবচেয়ে বেশি সেটি পরীক্ষা করার জন্য প্রথমে তাদের একটি উঁচু চেয়ারে বসানো হতো এবং যতক্ষণ না পর্যন্ত তারা চোখে অন্ধকার দেখতো ততক্ষণ চেয়ার ধরে ঘোরানো হত। আর একটা পরীক্ষা করত দম্পতি সেটি হল প্রথমে দুজনকে একটি খোলা জায়গায় বসিয়ে আকাশের দিকে তাক করে বন্দুকের ফায়ার করতো। সেই তীব্র আওয়াজে সাড়া দিয়ে প্রথমে আজকে উঠতো গুয়া। অর্থাৎ নানান পরীক্ষার মাধ্যমে এটাই বোঝা গিয়েছিল যে ডোনাল্ডের থেকে গুয়া বেশি স্মার্ট এবং তৎপর। তবে একটা সময় দেখা গেল যে যখন তারা দুজনেই বড় হয়ে উঠছিল তখন ডোনাল্ড কথা বলার দিক থেকে পারদর্শী হয়ে উঠলেও গুয়া সেটা করছিল না।

কেগলস দম্পতি এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা টানা ৫ বছর চালানো সিদ্ধান্ত নিল হঠাৎ নয় মাসেই তারা সমস্ত কিছু বন্ধ করে দিয়েছিলেন। যদিও হঠাৎ করে এই পরীক্ষা বন্ধ করার পেছনে কোন মজবুত কারণ তারা দেখাতে পারেননি। তবে বর্তমানে অন্যান্য বিশ্লেষকরা অনুমান করেন যে হয়তো দুই শিশু বড় হয়ে ওঠার সাথে সাথে তাদের শক্তি বৃদ্ধি পাচ্ছিল এবং গুয়ার শক্তি বেশি হওয়ার কারণে ডোনাল্ডের কোন ক্ষতি না হয় সেই কারণেই হয়তো দম্পতি পরীক্ষা বন্ধ করেছিলেন।

আবার অনেকের অনুমান যে ডোনাল্ড মানুষের মতো আচরণ করলেও গুয়া যেহেতু শিম্পাঞ্জি সে সবসময় কামড়ানো ও ঘেউ ঘেউ আওয়াজ করতে থাকতো, তাই নিজের বোনের কাছ থেকে এরকম আচরন পেয়ে হয়তো বিরক্ত হতো ডোনাল্ডো সেই কারণেও বন্ধ হতে পারে। কেগলস দম্পতি পরীক্ষা বন্ধ করার পর গুয়াকে পুনরায় তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে এসেছিলেন। পরীক্ষা বন্ধ হওয়ার কিছু বছর পর ১৯৭২ সালে কেগলস দম্পতি হঠাৎই মারা গিয়েছিলেন এমনকি ডোনাল্ডোর থেকে বিচ্ছেদের পর নিউমোনিয়ার আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছিল গুয়ারো। যেহেতু ডোনাল্ড একা ছিলেন তাই ৩৭ বছর বয়সে তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন। তবে এই বিষয়ে এখনও স্পষ্ট হওয়া যায়নি যে পরীক্ষার কারণে ডোনাল্ড আত্মহত্যা করেছেন কিনা! যেহেতু বাড়িতে পোষ্য জন্তুকে পোষা এবং তাকে একজন শিশুর মতই লালন পালন করা একটা স্বাভাবিক বিষয়, তাই এই পরীক্ষার কোন অস্বাভাবিক কিনা সেই বিষয়ে সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি বিজ্ঞানীরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Post

চিন্তা রেকর্ডিং করা ক্যামেরা থেকে তারবিহীন বিদ্যুৎ! নিকোলাস টেসলার যে ৪ টি আবিষ্কার আলোর মুখ দেখতে পায়নিচিন্তা রেকর্ডিং করা ক্যামেরা থেকে তারবিহীন বিদ্যুৎ! নিকোলাস টেসলার যে ৪ টি আবিষ্কার আলোর মুখ দেখতে পায়নি

নিকোলা টেসলা! যার হাত ধরে পৃথিবীতে শুরু হয়েছিল সহজলভ্য বিদ্যুৎশক্তির যুগ। তার একের পর এক আবিষ্কার সমাজের চিত্র পরিবর্তন করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল। যেমন – তাঁর আবিষ্কৃত এসি জেনারেটর

হোসেনশাহী বংশের উত্থানহোসেনশাহী বংশের উত্থান

রানা চক্রবর্তীঃ গৌড়-বঙ্গে হাবসী যুগের শেষ সুলতান ‘সামসুদ্দীন মুজাফরের’ আততায়ী হোসেন শাহ আরব ভাগ্যান্বেষী ‘সৈয়দ আসরাফের’ পুত্র ছিলেন। অনেক আশা আকাঙ্খা নিয়ে আসরফ বঙ্গদেশে এসেছিলেন, কিন্তু কোথাও কিছু সুবিধা না

চীনকে চাপে রাখতে আগামী পাঁচ বছরে ভারতের বিদেশনীতিতে মঙ্গোলিয়া ভীষণভাবে গুরুত্বপূর্ন হতে চলেছেচীনকে চাপে রাখতে আগামী পাঁচ বছরে ভারতের বিদেশনীতিতে মঙ্গোলিয়া ভীষণভাবে গুরুত্বপূর্ন হতে চলেছে

আগামী পাঁচ বছরে ভারতের বিদেশনীতিতে মঙ্গোলিয়া ভারতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ন হতে চলেছে। ভারতের কাছে স্ট্রাটেজিক্যালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন মঙ্গোলিয়া। পূর্ব এশিয়ায় অবস্থিত মঙ্গোলিয়ার সাথে পৃথিবীর দুটি অন্যতম শক্তিশালী দেশ রাশিয়া ও

মহাভারতের বিবর্তন – সনাতন ধর্মের বিবর্তন’মহাভারতের বিবর্তন – সনাতন ধর্মের বিবর্তন’

তারা চক্রবর্তীঃ পণ্ডিতদের মতে মহাভারত মহাকাব্যের ‘সূচনা’ এবং ‘চূড়ান্ত রূপায়ণ’ এই দুই পর্বের মধ্যে প্রায় আট শতাব্দী সময় কেটে গিয়েছিল – মূল বীর গাথা যা এই মহাকাব্যের বীজ এবং তার

‘গৌড়ের অধিকার নিয়ে মোঘল-পাঠান যুদ্ধ’‘গৌড়ের অধিকার নিয়ে মোঘল-পাঠান যুদ্ধ’

১৫৭৪ খৃষ্টাব্দের ১৫ই সেপ্টেম্বর তারিখে মোঘলরা তাড়ায় প্রবেশ করবার সঙ্গে সঙ্গে তৎকালীন গৌড়েশ্বর দাউদ কররানি অতি সঙ্গোপনে নিজের প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে পড়ে সপ্তগ্রামের পথ ধরে উড়িষ্যার দিকে চলে গিয়েছিলেন। তাঁর

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে রামকৃষ্ণ মিশন (প্রথম পর্ব)ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে রামকৃষ্ণ মিশন (প্রথম পর্ব)

রানা চক্রবর্তীঃ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম প্রধানতঃ তিনটি ধারায় প্রবাহিত হয়েছিল, (ক) সশস্ত্র বিপ্লব – চরমপন্থা আন্দোলন, (খ) গান্ধীজীর নেতৃত্বে অহিংস গণ আন্দোলন, এবং (গ) নেতাজি সুভাষচন্দ্রের নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ বাহিনীর